সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর, বাংলাদেশ যা পাবে

বাংলাপোস্ট
  • সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৫

১ এপ্রিল নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওতে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘চীন সফর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের একটা বড় সফলতা।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করে বলেন যে বিগত সরকারের সময়ে একটি দলের সাথে চীনের সরকারের সম্পর্কের বিচারে বর্তমান এই সম্পর্ক দুই দেশের সরকারের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ এনে দিয়েছে।

যেহেতু চীন একটি বড় অর্থনীতির দেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিচারে মার্কিন অর্থনীতির পরের অবস্থানেই রয়েছে চীনের অর্থনীতি, এক্ষেত্রে বাংলাদেশে আরও বড় চীনা বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে এর মধ্য দিয়ে। এটা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মূল্যায়ন।

এ বিষয়ের অবতারণা এ কারণে করা হলো যে, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় সরকার প্রধানের যেকোনো বিদেশ সফরের সময় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর সাথে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। এ বিচারে স্বাভাবিকভাবেই বলা যেতে পারে যে, দেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে যেহেতু এই সফর নিয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়নি, সেহেতু প্রধান উপদেষ্টার প্রথম এই দ্বিপাক্ষিক সফরটি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

সরল দৃষ্টিতে দেখলে এই সফরের মধ্য দিয়ে চীনের কাছ থেকে ২.১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, বিনিয়োগ এবং অনুদানের আশ্বাস পাওয়া গেছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করার পাশাপাশি বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে।

এই সফরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীন সরকারের যে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক এবং ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে এর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দুই দেশের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একটি ভিত্তি রচিত হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে।

চীনের বিশ্ববিখ্যাত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে, যা তিনি তথা আমাদের দেশের জয় একটা বড় সম্মান এবং বাংলাদেশি রোগীদের চীনের হাসপাতালগুলোয় উন্নত এবং স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার আশ্বাস একটি বড় সুযোগ—এসবকিছুই সাধারণের বোধগম্যতার মধ্যে একটি চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে যেমন নির্দেশ করে। এর বাইরেও এই সফর দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মধ্যে পারষ্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিকগুলো আরও শাণিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

এই সফরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীন সরকারের যে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক এবং ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে এর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দুই দেশের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একটি ভিত্তি রচিত হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের অভিজ্ঞতার আলোকে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আগামী ৫০ বছরের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান আহ্বান করা হয়েছে।

এছাড়া মংলা বন্দরের আধুনিকায়নের বিষয়েও দুই দেশ একত্রে কাজ করতে সম্মত হয়েছে, যা আগে ভারত এবং চীনের এক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা ছিল এবং আগামী দিনগুলোয় চীন এককভাবে কাজ করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর বাইরেও বিশেষভাবে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রে চীনের অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং এক্ষেত্রেও চীনের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে এতদিন ধরে সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরশীল গন্তব্য ছিল ভারত। বর্তমানে চীন সরকার এক্ষেত্রে এগিয়ে আসার আগ্রহ প্রকাশ করার পর যাতায়াত এবং চিকিৎসা খরচের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে চীনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সহনীয় পর্যায়ে রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

এক্ষেত্রে ত্বরিত পদক্ষেপ হিসেবে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং এর চারটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে নির্দেশ করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চীনের দিক থেকে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শিত হয়েছে, আর সেটা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমারের অসংখ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের সম্পৃক্ততা এবং জান্তা সরকারের সাথে চীন সরকারের সুসম্পর্ক থাকার কারণে ধারণা করা যায় যে, ভবিষ্যতের দিনগুলোয় বাংলাদেশে আরও ব্যাপক হারে চীনের বিনিয়োগকে মসৃণ রাখার স্বার্থে তারা এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবে।

মিয়ানমারের অসংখ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের সম্পৃক্ততা এবং জান্তা সরকারের সাথে চীন সরকারের সুসম্পর্ক থাকার কারণে ধারণা করা যায় যে, ভবিষ্যতের দিনগুলোয় বাংলাদেশে আরও ব্যাপক হারে চীনের বিনিয়োগকে মসৃণ রাখার স্বার্থে তারা এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবে।

কয়েকবছর আগেও এনিয়ে চীন সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান না হবার কারণে চীনের দিক থেকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে এনিয়ে খুব একটা কাজ করার সুযোগ ঘটেনি।

তাইওয়ান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। একে এবারের সফরে দিয়ে পূণর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে চীন সরকারের ‘এক চীন নীতি’তে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে দেশটিকে আশ্বস্ত করল এবং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাথে ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে চীনের দিক থেকে কোনো রকমের দ্বিধা থাকার কথা নয়।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে চীনের দরকার নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত সহযোগী। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে যে পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ ঘটেছে এবং তারা যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করে যাচ্ছে, এর ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে চীনের কোম্পানিগুলোর আরও বিনিয়োগের অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা তার সফরের শুরু করেন বোয়াও সামিট ফর এশিয়ায় যোগদানের মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি বিশেষভাবে কয়েকশ চীনের বিনিয়োগকারীর সাথে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে কেন বিনিয়োগকারীরা তাদের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবেন—এ বিষয়ে তার যুক্তি তুলে ধরেন, যা অনেক বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে উৎসাহিত করে।

ধারণা করা যায়, আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চীনের বিনিয়োগ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এবছর বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এর প্রাক্কালে প্রধান উপদেষ্টার এই সফর দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান চলমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও একটু ঝালাই করার বাইরেও এটি কীভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, সেটা চীনের দিক থেকেও অন্যতম প্রত্যাশা। আর তাই চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বিশেষ বিমান পাঠিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে সেখানে নেওয়া হয়েছে, যা একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

ইতিপূর্বে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তি ড. ইউনুসের অনেক পরামর্শকে সাদরে গ্রহণ করেছে। সেই ড. ইউনুস এখন বাংলাদেশের সরকার প্রধান এবং একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কীভাবে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবেন, এ বিষয়ে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

ড. ফরিদুল আলম ।। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরো
© All rights reserved ©
Developer Design Host BD