সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ অপরাহ্ন

কালো জাদুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায়

বাংলাপোস্ট
  • সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

কালো জাদু ও খারাপ জিনের উপদ্রব মানুষের জন্য ক্ষতিকর। কালো জাদুর মাধ্যমে অনেকেই অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে কালো জাদু থেকে সুরক্ষিত থাকার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের ১১৩তম সূরা, সূরা ফালাকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সব ধরনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। এ সূরায় কালো জাদু থেকে সুরক্ষা ছাড়াও হিংসুক প্রকৃতির মানুষের অনিষ্ট থেকে বাঁচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) নিজেও জিন ও বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস পাঠ করতেন।

সূরা ফালাক

কোরআনের ১১৩তম সূরা আল-ফালাক মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ সূরার প্রধান বিষয়গুলো হলো—

সৃষ্টির সব ধরনের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
কালো জাদু, জাদুবিদ্যা, বদনজর ইত্যাদির অস্তিত্ব এবং তা থেকে প্রতিকারের উপায়।

সূরা ফালাকের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। বলুন, আমি আশ্রয় নিচ্ছি প্রভাতের প্রতিপালকের।
সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে অব্যাহতভাবে আশ্রয় চাওয়া মুস্তাহাব। সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সাহাবি আবু সাঈদ (রা.) বলেন—

রাসুলুল্লাহ (সা.) জিন ও বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। এরপর যখন মুআউয়িযাতাইন, অর্থাৎ সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাজিল হলো, তখন তিনি এ দুই সূরা পাঠ করতে শুরু করলেন এবং অন্য কোনো পদ্ধতিতে আশ্রয় চাওয়া ছেড়ে দিলেন। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে।
এই আয়াতে মুমিনদের অন্য মানুষ, জিন, প্রাণী এবং সৃষ্টির অন্যান্য সব অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে।

এবং রাতের অন্ধকার যখন গভীর হয়, তখন তার অনিষ্ট থেকে।
এই আয়াতে রাতের অন্ধকারে সংঘটিত অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে। কারণ রাতে অনেক অশুভ আত্মা ও ক্ষতিকর প্রাণী বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

এবং গিঁটে ফুঁ দেয় এমন জাদুকরদের অনিষ্ট থেকে।
এই আয়াতে সব ধরনের কালো জাদু, জাদুবিদ্যা, বদনজর ইত্যাদির অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে মুমিনদের আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মদিনায় একবার মহানবীর (সা.) ওপরও কালো জাদুর প্রভাব পড়েছিল। নবীজির স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) জাদুর প্রভাবে এমন অবস্থায় পড়েছিলেন যে, তিনি মনে করতেন তিনি এমন কিছু করেছেন, যা বাস্তবে করেননি। তবে ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে ওই জাদুর কোনো প্রভাব তার ওপর পড়েনি। এ অবস্থা চলতে থাকে। একদিন তিনি আমার কাছে থাকা অবস্থায় বারবার আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। এরপর বললেন, আয়েশা, তুমি কি জানো, আমি যে বিষয়ে আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে তিনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, কী বিষয়ে?

তিনি বললেন, দুজন ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে আমার কাছে এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসেছিলেন। তাদের একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যক্তির কী হয়েছে? অন্যজন বললেন, তিনি জাদুর প্রভাবে আক্রান্ত। প্রথমজন জিজ্ঞেস করলেন, কে তার ওপর জাদু করেছে? অন্যজন বললেন, বনি জুরাইক গোত্রের ইহুদি লাবিদ ইবনুল আসাম। প্রথমজন আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী দিয়ে জাদু করা হয়েছে?

অন্যজন বললেন, একটি চিরুনি, তাতে আটকে থাকা চুল এবং পুরুষ খেজুরগাছের পরাগের আবরণ দিয়ে। প্রথমজন জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কোথায় রাখা হয়েছে? অন্যজন বললেন, ধারওয়ান নামের একটি কূপে।

এরপর নবীজি কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে ওই কূপের কাছে গেলেন এবং সেটি দেখলেন। কূপটির চারপাশে খেজুরগাছ ছিল। এরপর তিনি আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর কসম, ওই কূপের পানি এমন লাল ছিল, যেন তাতে মেহেদি পাতার রং মিশে আছে। আর সেখানকার খেজুরগাছগুলো দেখতে শয়তানের মাথার মতো ছিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি ওই জিনিসগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন? তিনি বললেন, না। আল্লাহ আমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন। আর আমি আশঙ্কা করেছিলাম, বিষয়টি মানুষকে জানালে তাদের মধ্যে এর অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়বে। এরপর তিনি কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি)

কালো জাদু একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। কোরআন ও নবীজির সুন্নাহতেও এর উল্লেখ রয়েছে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কালো জাদু করা হারাম। এ কারণে ৪০ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হয় না। আর কোনো জাদুকর বা গণকের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করলে একজন ব্যক্তি কাফির হয়ে যায়।

কালো জাদুর প্রতি বিশ্বাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো গণক, জাদুকর বা ভবিষ্যৎবক্তার কাছে গিয়ে তাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করে এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর যা নাজিল করা হয়েছে, তা অস্বীকার করল।

কালো জাদু করার অনিষ্ট সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জাদু করে, সে মুশরিক। (তাবারানি)

যে আমল করবেন

মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত হিসেবে যে কোরআন নাজিল হয়েছে, তার শক্তির মাধ্যমে জাদুর প্রভাব দূর করা যায়। শয়তানের কুমন্ত্রণা, কালো জাদু, জাদুবিদ্যা, বদনজর ইত্যাদি থেকে বাঁচতে একজন মুসলিমের উচিত কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো নিয়মিত পড়ার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া। বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস অর্থাৎ কোরআনের শেষ তিনটি সূরা পাঠ করা উচিত।

এবং হিংসুক ব্যক্তি যখন হিংসা করে, তখন তার অনিষ্ট থেকে।
হিংসুক হলো এমন ব্যক্তি, যে অন্যের মধ্যে কোনো নিয়ামত দেখতে পেয়ে তা দূর হয়ে যাক বলে কামনা করে এবং সেই নিয়ামত দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। তাই মানুষের উচিত তার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

আরো
© All rights reserved ©
Developer Design Host BD